
জামায়াতের পলিসি সাম্মিটের কিনোট স্পিকার কে এই ড. আশিকুর রহমান?
ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বহুল আলোচিত পলিসি সাম্মিট ২০২৬ – এসপায়ারিং বাংলাদেশ। ‘লেটস বিল্ড বাংলাদেশ টুগেদার’- শিরোনামে এই সম্মেলনে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের কূটনীতিক, দেশি–বিদেশি সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক, সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
এই উচ্চপর্যায়ের পলিসি সাম্মিটে ৬টি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন নীতিখাত উপস্থাপন করা হয়, যেখানে প্রতিটি খাতে একজন করে বিশেষজ্ঞ কিনোট স্পিকার বক্তব্য প্রদান করেন। এই ছয়জন কিনোট স্পিকারের একজন ছিলেন ড. মো. আশিকুর রহমান, যিনি অংশ নেন— সেশন ৩ – “Youth Employment – Unleashing the Power of Gen-Z and Alpha (যুব কর্মসংস্থান – জেন-জেড এবং আলফার শক্তি উন্মোচন)” শীর্ষক অধিবেশনে।
তার কিনোট বক্তৃতায় ড. আশিকুর রহমান তরুণদের দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা, বৈশ্বিক শ্রমবাজার, স্কিল গ্যাপ, শিক্ষা সংস্কার, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মবিলিটির মাধ্যমে টেকসই যুব কর্মসংস্থানের বাস্তবভিত্তিক নীতিপরামর্শ উপস্থাপন করেন।
তিনি জামায়াতের ইয়ুথ পলিসি, তরুণদের ঘিরে বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান সহ তরুণদের কর্মসংস্থান ঘিরে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন। তরুণদের জন্য পরিকল্পনায় – ৫ বছরে ১০ মিলিয়ন তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ এবং সমন্বয়ের লক্ষ্যে উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন; প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫ মিলিয়ন জব এক্সেস নিশ্চিত এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এবং স্কিল রিক্যালিব্রেশন স্কলারশিপ চালু; নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লক্ষ উদ্যোক্তা তৈরি; ১.৫ মিলিয়ন ফ্রিল্যান্সার তৈরিসহ দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য সমন্বিত গভারন্যান্স এবং তরুণদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন। তার কিনোটে তিনি বলেন—“বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ তখনই কার্যকর হবে, যখন তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান একই নীতিগত ছাতার নিচে আনা যাবে।”
তার বক্তব্য সম্মেলনে উপস্থিত কূটনীতিক, উন্নয়ন সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করে।
কে এই ড. আশিকুর রহমান?
ড. মো. আশিকুর রহমানের জন্ম কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বাগমারা দক্ষিণ ইউনিয়নের উত্তর দৌলতপুর হদগড়া গ্রামে। উত্তর দৌলতপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই তার শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরবর্তীতে বাগমারা উচ্চ বিদ্যালয়, ইবনে তাইমিয়া স্কুল এন্ড কলেজ এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজে পড়ালেখা করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এপ্লাইড ফিজিক্স, ইলেক্ট্রনিকস এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে তিনি ইউরোপীয়ান কমিশন অর্থায়িত মর্যাদাপূর্ণ ইরাসমুস মুন্ডুস মাস্টার্স প্রোগ্রামে–এ নির্বাচিত হয়ে একসাথে তিনটি ইউরোপীয় দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন— ইটালির স্যাপিয়েঞ্জা ইউনিভার্সিটি দি রোমা, গ্রিসের এরিস্টটল ইউনিভার্সিটি অব থেসালিনিকি এবং পর্তুগালের ইভোরা ইউনিভার্সিটি। এই যৌথ মাস্টার্স ডিগ্রি তিনি সম্পন্ন করেন ‘সুম্মা কাম লাউডে’ সহ, যা ইতালিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ একাডেমিক সম্মান।
মাস্টার্স শেষ করার পর ড. আশিকুর রহমান ইউরোপীয় কমিশনের আরেকটি মর্যাদাপূর্ণ ম্যারি-কুরি প্রোগ্রামের আওতায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পিএইচডি ছিল স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের অধীনে স্পেনের জারাগোজা ইউনিভার্সিটি ও বুরগোস ইউনিভার্সিটি, ফ্রান্সের বরদৌ ইউনিভার্সিটি এবং পর্তুগালের ইভোরা ইউনিভার্সিটি -এর যৌথ তত্ত্বাবধানে। পিএইচডি পরবর্তী সময়ে তিনি স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের –এ পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্ভাবনী প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ, নীতিবিশ্লেষক, শিক্ষা-কূটনীতিক ও গবেষক হিসেবে বিশ্বব্যাপী কাজ করছেন।
ড. আশিকুর রহমান বর্তমানে ইউরোপিয়ান কমিশনের ইরাসমুস+ ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্টস সাপোর্ট টিমের এশিয়া রিজিউনাল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশের ইউরোপিয়ান স্কলারদের প্রতিনিধিত্বকারী বৃহত্তম নেটওয়ার্ক ইরাসমুস মুন্ডুস এসোসিয়েশনের সেন্ট্রাল প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বর্তমানে তিনি গবেষকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন – ম্যারিকুরি এলামনাই এসোসিয়েশনের গ্লোবাল মবিলিটি ও ব্রেইন সার্কুলেশন টিমের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং প্রফেসর, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম – ইউনিভের ফাউন্ডার এবং প্রধান নির্বাহী,এবং ইতালির রোম শহরের বাংলাদেশী কমুনিটি প্রতিষ্ঠিত মডার্ন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। এছাড়াও তিনি বহু আন্তর্জাতিক পেশাজীবী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি
গ্রামবাংলা থেকে ইউরোপীয়ান কমিশনের সর্বোচ্চ স্কলারশিপ, বৈশ্বিক গবেষণা নেতৃত্ব এবং এখন জাতীয় নীতিসংলাপে কিনোট স্পিকার—ড. আশিকুর রহমানের এই যাত্রা আজ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সাম্মিটে তার অংশগ্রহণ প্রমাণ করে— বাংলাদেশের যুবনীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কণ্ঠ আজ জাতীয় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই সম্মেলনে কেবল একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়; বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে তরুণ, দক্ষ ও বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে তুলে ধরেছে—যেখানে ড. আশিকুর রহমানের মতো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।