
১৪শ’ বছরের মসজিদে গামামাহ: মহানবী (সা.) – এর স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক নিদর্শন
মদিনা মুনাওয়ারার বুকে মসজিদে নববীর দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী-মসজিদে গামামাহ। এটি শুধু একটি প্রাচীন মসজিদ নয়; বরং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এমন একটি পবিত্র স্থান, যা ইসলামের ইতিহাস, সুন্নাহ ও মদিনার ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
ইসলামিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিজরতের ষষ্ঠ বছরে মহানবী (সা.) এই স্থানকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সালাত আদায়ের জন্য ঈদের মুসাল্লা হিসেবে নির্ধারণ করেন। কারণ, এর আগে যে স্থানে তিনি ঈদের নামাজ আদায় করতেন, সেখানে ততদিনে জনবসতি গড়ে উঠেছিল।
মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর খেলাফতকালেও এই স্থান ঈদের সালাতের জন্য ব্যবহৃত হতো। পরে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে এখানে একটি স্থায়ী মসজিদ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী যুগে বিভিন্ন শাসকের আমলে একাধিকবার সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ হলেও এর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। চারটি শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর স্থাপিত বৃহৎ গম্বুজটি এর প্রধান আকর্ষণ। গম্বুজের উপরের ছোট ছোট জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ভেতরে প্রবেশ করে, যা মসজিদের অভ্যন্তরে এক স্নিগ্ধ ও প্রশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। গম্বুজের ভিত্তি ও কোণগুলো জিপসামের সূক্ষ্ম কারুকাজে অলংকৃত। পুরো অভ্যন্তর সাদা রঙে সজ্জিত, যা সরলতা ও সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয় তুলে ধরে।
মসজিদের উত্তর পাশে একটি গোলাকার মিনার রয়েছে, যাতে একটি মাত্র বারান্দা এবং শীর্ষে ধাতব অলংকরণ সংযোজিত হয়েছে। পূর্ব দেয়াল কালো পাথরে আবৃত হওয়ায় সাদা-কালো রঙের মনোরম বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ দেয়ালের মাঝখানে ইমামের মিহরাব অবস্থিত। মসজিদটি মসজিদে নববীর এতটাই নিকটে যে, এর ভেতরে কোনো মিম্বর নির্মাণ করা হয়নি।
’গামামাহ’ শব্দের অর্থ মেঘ। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, একবার মহানবী (সা.) এই স্থানে বৃষ্টির জন্য বিশেষ দোয়া করলে আকাশে মেঘ জমে এবং আল্লাহর রহমতে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই মসজিদটির নাম রাখা হয় মসজিদে গামামাহ।
আজও মসজিদে গামামাহ শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়; এটি মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ, ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং মদিনার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য স্মারক। প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত লাখো মুসল্লি এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখে মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন।
খান মোহাম্মদ রুবেল হোসেন
কলামিস্ট